ইন্টারনেটের সাতকাহন (৪র্থ অংশ)
হ্যাকারঃ
হ্যাকার হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি নিরাপত্তা/অনিরাপত্তার সাথে জড়িত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল দিক খুঁজে বের করায় বিশেষভাবে দক্ষ অথবা অন্য কম্পিউটার ব্যবস্থায় অবৈধ অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম বা এর সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং কোন প্রকার অনুমতি ছাড়াই অন্যের ব্যক্তিগত সাইটে বা প্রোফাইলে প্রবেশ করে তথ্য চুরি করে।
এ কাজটিকেই হ্যাকিং বলা হয়ে থাকে।
হ্যাকিং এমন একটি শব্দ যা শুনতেই আমাদের মনে প্রথম কথাটি আসে, “যে ভাই কিছু তো গণ্ডগোল রয়েছে, মনে হয় অবৈধ কোন ব্যাপার ঘটছে।” কিন্তু আপনার মন্তব্যটি কি সম্পূর্ণ সত্য? হ্যাঁ সত্য তো বটেই, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য নয়। কেনোনা কিছু ভালো হ্যাকার রয়েছে আবার কিছু খারাপ হ্যাকার রয়েছে। এবং তাদের
অ্যাকটিভিটি ভালো এবং মন্দ উভয় দিকেরই হয়ে থাকে। ছোট বেলায় আপনি হয়তো জেনেছেন যে, কিছু ভালো ভূত থাকে আবার কিছু খারাপ ভূত থাকে হ্যাকারও ঠিক একই রকমের হয়ে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো কে ভালো আর কে মন্দ? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে আপনাকে জানতে হবে হ্যাকারের প্রকারভেদ সম্পর্কে।
হ্যাকার প্রধানত তিন প্রকারের হয়ে থাকে। যারা ভালো কাজের জন্য হ্যাকিং করে তাদের বলা হয়ে থাকে হোয়াইট হ্যাট হ্যাকারস (White Hat Hackers)। যারা মন্দ হ্যাকার তাদের বলা হয় ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস (Black Hat Hackers)। আর যারা ভালো আর মন্দ মাঝামাঝি হয়ে থাকে তাদের বলা হয়ে থাকে গ্রে হ্যাট হ্যাকারস (Grey Hat Hackers)। এই হল হ্যাকার এর প্রকারভেদ।
হ্যাকিং এর ইতিহাসঃ
সত্তরের দশকে আবির্ভাব ঘটে ফ্রিকদের। এরাও একধরেনের হ্যাকার কিন্তু তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী এই নামকরণ করা হয়। এরা টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে বিনা খরচে কথা বলতো টেলিফোনে।
১৯৭০ সালে টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করার জন্য John Thomas Draper নামে একজন ফ্রিকার কে একাধিক-বার গ্রেফতার করা হয়। যিনি Captain Crunch নামেও পরিচিত। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার Homebrew Computer Club এর দুজন সদস্য। “blue boxes” নামে একধরনের ডিভাইস তৈরি করে যা দিয়ে টেলিফোন সিস্টেমের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে ফ্রী-তে কথা বলা যেত।
এই দুজন পরে “Berkeley Blue” ও “Oak Toebark” নামে পরিচিতি লাভ করে। আর শুনে তাজ্জব হবেন যে এরা দুজন ছিলোঃ “Berkeley Blue” (Steve Jobs) and
“Oak Toebark” (Steve Wozniak) যারা পরবর্তীতে Apple Computer
প্রতিষ্ঠা করেন।
এরপর আশির দশকে ৬ জন্য হ্যাকার ৬০ টি হাই-প্রোফাইল কম্পিউটার নেটওয়ার্ক হামলা চালায় যার মধ্যে ছিল Los Alamos National Laboratory, Sloan-Kettering Cancer Centre এবং Security Pacific Bank অন্যতম। এই হ্যাকাররা সবাই ছিলো MIT এর হ্যাকার দলের সদস্য। ১৯৮৩ সালে এই ৬ জন হ্যাকার কে গ্রেফতার করা হয়। ওই বছরেই Turing Award পাওয়া Ken Thompson নামে এক কম্পিউটার বিজ্ঞানী তার এক ভাষণে কম্পিউটারের জন্য ক্ষতিকর একটি প্রোগ্রাম Trojan horse ম্যালওয়ার এর কথা উল্লেখ করেন।
১৯৮৩ সাল থেকে নিয়মিত ভাবে প্রকাশ হতে থাকে হ্যাকিং নির্ভর ম্যাগাজিন ২৬০০ যা হ্যাকারদের জন্য নানা ধরনের টিপস নিয়ে প্রকাশিত হত। আর ক্রমেই বাড়তে থাকে হ্যাকারদের উৎপাত।
এরমধ্যে ১৯৮৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার “Computer Fraud and Abuse Act” নামে হ্যাকিং রোধে আইন প্রণয়ন করলেও তাতে হ্যাকাররা থেমে থাকেনি বরং আরও বিস্তৃত হতে থাকে তাদের কার্জক্রম।
এরপর ১৯৮৮ সালে “অর্পানেট (ARPANET)” এর নেটওয়ার্কের ৬০০০ টি কম্পিউটার সিস্টেমে ছড়িয়ে পরে “মরিস ওয়ার্ম (Morris worm)” নামক এক ভাইরাস। সেই বছরই ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক অফ শিকাগো ৭০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয় কম্পিউটার হ্যাকিং এর ফলে।
এরপর ১৯৮৩ সালে “ডাটা স্ট্রিস” এবং “কুজি” নামক দুই হ্যাকার গ্রিফিথের এয়ারফোর্স বেজ(Griffiss Air Force Base), নাসার নেটওয়ার্ক হ্যাক করে।
১৯৯৭ সালে মাইক্রোসফটের Windows NT অপারেটিং সিস্টেমে হাই প্রোফাইল আক্রমণ হয়। ১৯৯৮ সালে হামলা হয় Pentagon এর তথ্য ভাণ্ডারে।
চলুন নিচে আরো কয়েক প্রকারের হ্যকারদের সংগে পরিচিত হয়ে আসি,
Anarchists: Anarchists হচ্ছে ঐ সকল হ্যাকার যারা বিভিন্ন কম্পিউটার সিকিউরিট সিস্টেম বা অন্য কোন সিস্টেম কে ভাঙতে পছন্দ করে। এরা যেকোন টার্গেটের সুযোগ খুজে কাজ করে।
Crackers: অনেক সময় ক্ষতিকারক হ্যাকার দের ক্র্যাকার বলা হয়। খারাপ হ্যকাররাই ক্র্যাকার। এদের শখ বা পেশাই হচ্ছে ভিবিন্ন পাসওয়ার্ড ভাঙ্গা এবং Trojan Horses তৈরি করা এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক সফটওয়ার তৈরি করা।
ক্ষতিকারক সফটওয়ারকে Warez বলে। এসব ক্ষতিকারক সফটওয়ারকে তারা নিজেদের কাজে ব্যবহার করে অথবা বিক্রি করে দেয় নিজের লাভের জন্য।
Script kiddies: এরা কোন প্রকৃত হ্যকার নয়। এদের হ্যাকিং সম্পর্কে কোন বাস্তব জ্ঞান নেই। এরা বিভিন্ন Warez ডাউনলোড করে বা কিনে নিয়ে তার পর ব্যবহার করে হ্যাকিং ।
তবে জনপ্রিয় সোস্যাল সাইট ফেইসবুকে কিছু খারাপ লোক কিছু লিঙ্ক শেয়ার করে এবং লোভ দেখায় ছবি সহ ফ্রি ফেবু চালান শুধু এই লিঙ্কে প্রবেশ করেই। এছাড়া অনেকে বলছে আপনার ফেইসবুক থিম চেইঞ্জ করুন আর সবাইকে অবাক করে দিন ।এখন অনেকেই চান তার পোফাইলে অনেক বন্ধু হোক বা অনেক লাইক পড়ুক তার ছবিতে। এটাও তাদের একটা হাতিয়ার। আরো অনেক রকম কথা বলে তারা আপনাকে তাদের বানানো ফিশিং সাইটে নিয়ে যাবে আর সেখানে আপনাকে আরেকবার নতুন করে আপনার আইডি তে লগ ইন করতে বলা হবে। লগ ইন করলেন তো নিজের আইডির সব তথ্য তাদের হাতে তুলে দিলেন। তারা আপনার কাছে তখন টাকা দাবী করে বসবে। এছাড়াও আপনার বন্ধু তালিকার অনেক মেয়ে বন্ধুকে খারাপ মেসেজ পাঠাবে বা তাদের কাছে মিথ্যা কথা বলে টাকা ধার চাইবে। এসব ঘটনা এখন প্রায়ই ঘটছে। এছাড়া আপনার ইনবক্সের ব্যক্তিগত মেসেজ গুলা তো আছেই। সেগুলা হয়তো আপনাকে আরো ভয় পাইয়ে দিবে। সুতরাং সবার উচিত এসব থেকে সাবধান থাকা।
এসব ফিসিং সাইট বানানো আহামরি কিছু না। জাস্ট ফেইসবুকের হোম পেইজের এইচ টি এম এল কোড গুলা আপনার সংগ্রহ করে নিতে হবে। গুগলে খুব সহজেই পাবেন। অথবা আপনি যদি এসব নিয়ে পড়া শোনা করেছেন বা করছেন তাহলে তো আপনার কাছে কিছুই না। খুব সহজ কিছু কোডিং। এর পরে যে কোন একটা ওয়াপকা তে আপনাকে একটা আইডি খুলে নিতে হবে এবং সেখানে আপনি নিজের নামে একটি সাইট বানাতে পারবেন। কিন্তু আপনার সাইটের পেইজটা দেখতে হবে ফেইসবুকের হোম পেইজের মত দেখতে যদি সেই কোড গুলা ব্যবহার করে থাকেন। এর পর আপনার একটই নিজস্ব ইউ আর এল থাকবে মানে একটি লিঙ্ক যা আপনার নতুন বানানো সাইটের। যেটাতে কেউ লগ ইন করলেই লগ ইন করা লোকের মেইল বা ফোন নাম্বার এবং পাসওয়ার্ড আপনার কাছে মেইলের মাধ্যমে চলে আসবে আর আপনি তার প্রোফাইলে ঢুকতে পারবেন। কিন্তু সে কিছুই বুঝতে পারবেনা। যা হোক এ বিষয়ে পরে আরো বলা যাবে।
এবার জানা যাক বাংলাদেশি কিছু হ্যাকার গ্রুপের নাম;
- এক্সপায়ার সাইবার আর্মি
- বাংলাদেশ ব্ল্যাক হ্যাট হ্যাকারস
- হেক্সরোসিস্ট
- বাংলাদেশ সাইবার আর্মি
- সাইবার ৭১
- বাংলাদেশ গ্রে হ্যাট হ্যাকারস
Gary McKinnon
Kevin Mitnick
Jonathan James
Adrian Lamo
George Hotz
হ্যাকিং থেকে বাঁচার কিছু অতি প্রয়জনীয় ট্রিক্সঃ
১. কোন অপরিচিত সফটওয়ার ডাউনলোড করা বা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন এমন কি তা যদি আপনার বন্ধুও বলে ব্যবহার করতে।যদি কোন সফটওয়ার নিতান্তই ডাউনলোড করা লাগে আগে তার সম্পর্কে নেটে সার্ছ করে যেনে নিতে হবে ।
২. কোন সাইটে লগ-ইন করার সময় সাটের এডড্রেসটা ভালো ভাবে চেক করে নিতে হবে। হয়ত সাইটের নাম আপনার পরিচিত কোন সাইটের নামের মতই হবে কিন্তু ২-১ অক্ষর হয়তো সামনে পিছনে যাকবে যা আপনি দেখলেও বুঝতে পারবেন না। যেমন, faecbook, facbook, fasebook, facebok ইত্যাদি । মেইল থেকে পাওয়া লিঙ্ক দিয়ে কোথাও লগ-ইন করা থেকে বিরত থাকবেন।
৩. আপনি যদি একজন ডেভেলপার হন তাহলে তোমাকে অবশ্যই সাধারন ব্যবহারকারী থেকে আরো ভালো করে সিকিউরিটি সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।
৪. পাসওয়ার্ড সব সময় ৮ ডিজিটের বেশি দিন। কী জেনারেটর সফটয়ার গুলো মাধ্যমে সাধারন কম্পিউটারদিয়ে এর বেশি ডিজিটের পাসওয়ার্ড ভাংতে পারেনা। অক্ষর এবং নাম্বার দিয়ে পাসওয়ার্ড দিতে পারেন। তবে কখনোই নিজের নাম, ফোন নাম্বার বা জন্ম তারিখ দিবেন না।
৪. আর অপরিচিত সাইটে লগ-ইন করা থেকে বিরত থাক।
৫.আর আগেই যেটা বলেছিলাম যে ফিশিং সাইট। সুতরাং খারাপ মানুষ গুলা আপনাকে বিপদে ফেলার জন্য বিভিন্ন লোভ দেখাবেই। নিজের ভালোর জন্য আপনাকেই নিরাপদ থাকবে। ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।
এর পর আমাদের ইন্টারনেটের সাতকাহন ধারাবাহিকের শেষ অংশ প্রকাশ করা হবে। পড়বেন আশা করি।
লেখাঃ
খালিদ হাসান

No comments