পঞ্চগড়ে শুরু হয়েছে ‘ভাদর কাটানি’ উৎসব
স্বামীর মঙ্গল কামনায় পঞ্জিকা মতে বুধবার (১লা ভাদ্র) থেকে পঞ্চগড়ে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ভাদর কাটানি উৎসব। আবহমানকাল থেকে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব পালন করার জন্য এরই মধ্যে নববধূরা দলে দলে শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে ছুটছেন। ভাদর কাটানি উৎসব পালন করতে বাড়িতে বাড়িতে চলছে নানা আয়োজন।
উত্তরাঞ্চলের প্রচলিত রীতি ও জনশ্রুতি অনুযায়ী ভাদ্র মাসের প্রথম ৩ থেকে ৭ দিন স্বামী নববধূর মুখ দর্শন করলে তার চোখ অন্ধ হয়ে যায় এবং স্বামীর অকল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই বিয়ের পর প্রথম পাওয়া ভাদ্র মাসের ৩ থেকে ৭ দিন বাপের বাড়িতে অবস্থান করে নববধূরা। তবে এর কোন দালিলিক প্রমান না থাকলেও যুগ যুগ ধরে এই এলাকার মানুষ এসব আচার অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন। প্রাচীন কাল থেকে আজও এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে । রীতি অনুযায়ী নববধূরা এই সময় সাধারণত বাবার বাড়িতে অবস্থান করে এবং স্বামীর মঙ্গল কামনা করে।
ভাদর কাটানি উৎসব উপলক্ষে পঞ্চগড়ের ঘরে ঘরে ভিন্ন আমেজ বিরাজ করছে। এরই মধ্যে অধিকাংশ নববধূ স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে চলে গেছেন। এই প্রবণতাটি শহরের চেয়ে গ্রামাঞ্চলে একটু বেশি। নববধূরা তাদের স্বামীর মুখ দর্শন করবে না ভাদ্র মাসের প্রথম ৩ থেকে ৭ দিন। তাই নববধূরা তাদের স্বামীর বাড়ি থেকে এই ৩ থেকে ৭ দিনের জন্য বাবার বাড়িতে নাইওর যায় ।
গত বছরের আশ্বিন মাস থেকে এ বছরের শ্রাবণ মাস পর্যন্ত যাদের বিয়ে হয়েছে তাদের নিয়েই এই আয়োজন। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর জীবনে প্রথম ভাদ্র মাসের প্রথম তিন দিন বা সাত দিন স্ত্রী স্বামীর মুখ দর্শন করলে স্বামীর চোখ অন্ধ হয়ে যাবে বা অমঙ্গল, ঝগড়া-বিবাদসহ তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হবে না এমন বিশ্বাস থেকে উত্তরাঞ্চল জুড়ে শ্রাবণ মাসের শেষ ৭ দিন নববধূরা মা-বাবার বাড়িতে নাইওর যাওয়া শুরু করে। এটাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ভাদর কাটানি। এ উৎসবটি পালনে নববধূদের বাড়িতে পড়ে যায় সাজ সাজ রব। থাকে নানা আয়োজন। নববধূরা যে ক’দিন বাবার বাড়িতে অবস্থান কবে, সে ক’দিন তারা সামর্থ অনুযায়ী মেয়েকে ভাল-মন্দ খাওয়াবে। প্রচলিত এ প্রথাটি যুগ যুগ ধরে এ অঞ্চলে এভাবেই চলে আসছে। তবে কবে থেকে কিভাবে এই প্রথার শুরু তার সঠিক তথ্য কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। নববধূকে আনতে তার ছোট ভাই, বোন, বান্ধবী, নানী, চাচী, ফুফু ও প্রতিবেশিরা যাবে বরের বাড়িতে। সাথে নিয়ে যাবে সামর্থ মত মুড়ি, পায়েস, নানা রকমের ফল, মিষ্টি। কেউ ভাদ্র মাসের আগের দিন আবার কেউ কয়েকদিন বাকি থাকতেই যায় বরের বাড়িতে। বর পক্ষ সাধ্যমত তাদের আপ্যায়ন করে। নববধূরা মা-বাবার বাড়িতে তিনদিন বা সাতদিন থাকে। এরপর বরপক্ষের লোকজনও কনেকে আনতে যায়। তারা তাদের সাধ্যমত ফল, মিষ্টি, পায়েস, মুড়ি, মুড়কি, দই ইত্যাদি নিয়ে যায়।
স্থানীয় প্রবীণ লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রাচীন এ লোকাচার তারা দেখে আসছেন। এই উৎসবটি উত্তরাঞ্চলের সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে। কেউ কেউ এটাকে কুসংস্কার বললেও সামাজিক রীতির ভাদর কাটানি স্থানীয় লোকেরা শ্রদ্ধার সাথে পালন করে আসছেন।
জেলার সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের গোলাবাড়ি এলাকার রবিলাল দেবের মেয়ে রঞ্জিতার রানীর ছয় মাস আগে বিয়ে হয়েছে জেলার আটোয়ারী উপজেলার তড়িয়া ইউনিয়নের বারঘাটি এলাকার অনিল দেবের ছেলে বাবুলাল দেবের সাথে। ভাদর কাটানি উৎসবের অংশ হিসেবে রঞ্জিতার রানীও চলে গেছেন বাবার বাড়িতে।
রঞ্জিতার রানী জানান, ‘বিয়ের পর ভাদর কাটানি পালন করতে বাবার বাড়ি এসেছি। অনেকেই বলে এটা কুসংস্কার তারপরও আমাদের পূর্ব পুরুষরা এটা করে এছেসে। তাছাড়া অনেকদিন পর বাবার বাড়িতে আসতে পেরে বেশ ভালোই লাগছে।’
এদিকে এই উৎসবে পিছিয়ে নেই উত্তরাঞ্চলের মুসলমান ধর্মের দম্পতিরাও। সম্প্রতি জেলার সদর উপজেলা পঞ্চগড় সদর ইউনিয়নের ঝাকুয়াকালী এলাকার খোরশেদ আলমের মেয়ে খালেদা আক্তারের সাথে বিয়ে হয়েছে একই ইউনিয়নের
ভুষিভিটা এলাকার জামাল উদ্দীনের ছেলে মিজানুর রহমানের। শ্রাবণের শেষ প্রান্তে এসে নববধূ খালেদা আক্তারকেও ভাদর কাটানি হিসেবে বাবার বাড়িতে নিয়ে গেছে তার আত্মীয়-স্বজনরা এসে।
পঞ্চগড় দেবীগঞ্জ উপজেলার খোঁচাবাড়ী এলাকার সুরবালা (৫২) বলেন, ‘আমাদের পূর্ব পুরুষ ভারতের জলপাইগুড়ি থাকতেন। দেশ বিভাগের পর আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। ভারতে হিন্দু-মুসলমান প্রতিটি পরিবারে ভাদর কাটানি উৎসব ঘটা করে পালন করা হতো। এটা তিনি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন বলে জানান।’
পঞ্চগড়ের কলেজ শিক্ষক সতেন্দ্রনাথ রায় বলেন, ‘ভাদর কাটানি হলো আমাদের সমাজের প্রাচীন একটি প্রথা। এটা লোকাচার হলেও আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। এ উৎসব আমরা জন্ম থেকেই দেখে আসছি। নব বিবাহিত প্রত্যেক দম্পতির জীবনে এটা একবার আসে। তবে এক সময় এই প্রথা অনুযায়ী পুরো ভাদ্রমাস নববিবাহিত দম্পতিরা একে অপরের মুখ দর্শন নিষেধ থাকলেও এখন কেউ সাতদিন আর কেউ কেউ তিন দিন পালন করছেন। তবে এই উৎসব মুসলমানদের দেয়ে সনাতন ধর্মালম্বীরা বেশি গুরুত্ব দিয়ে পালন করে বলে জানান তিনি।’
স্থানীয় লোকজনের ধারণা উত্তরাঞ্চলে এক সময় সম্ভ্রান্ত হিন্দু সম্প্রদায় বসবাস করতো। তাদের এ রেওয়াজ ক্রমানয়ে এ অঞ্চলের মানুষকে প্রভাবিত করে। এভাবে এক সময় এটা এ অঞ্চলের সংস্কৃতির অংশ হয়ে যায়। হিন্দু সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠান থেকে এ ভাদর কাটানির জন্ম হলেও বর্তমানে এটা এ অঞ্চলের সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ঠাঁই করে নিয়েছে। প্রতিবছর শ্রাবণ মাসে বিয়ের ধুম পড়ে যায়। যা অনেকটা প্রতিযোগীতার মতই। এরপর পুরো ভাদ্র মাসই বিয়ে বন্ধ থাকে।
অনেকেই কুসংস্কার বলে এই নিয়ম থেকে বেড়িয়ে এসেছেন তবে এর সংখ্যা খুবই কম। কালের আবহে মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে এ লোকাচার কমতে শুরু করেছে। সনাতন ধর্মালম্বীরা আজও গুরুত্বের সাথে এ লোকাচার পালন করে আসছে।
ভাদর কাটানি নিয়ে নানা মানুষের নানা মত থাকলে এটি উত্তরাঞ্চল তথা পঞ্চগড় জনপদের একটি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বার্তা বহন করে। বাংলার নারী হৃদয়ে পতিভক্তির এই সংস্কৃতি এ অঞ্চলের নারীদের যেমন উজ্জল করেছে তেমনি সমৃদ্ধ করেছে আবহমান কালের সংস্কৃতি। দাম্পত্য জীবনে শান্তি কামনায় ঐহিত্যবাহী এ উৎসবে পঞ্চগড় জনপদের ঘরে ঘরে নববধূকে বাবার বাড়িতে বরণ করা হয়েছে ।
লেখা ঃ তারেকুর রহমান তুষার
তথ্য ঃ বিভিন্ন বই , ইন্টারনেট
ছবি ঃ সংগ্রহীত
লেখা ঃ তারেকুর রহমান তুষার
তথ্য ঃ বিভিন্ন বই , ইন্টারনেট
ছবি ঃ সংগ্রহীত

No comments