ইন্টারনেটের সাতকাহন (শেষ অংশ)
ইন্টারনেটের সাতকাহন ধারাবাহিক লেখার প্রতিটা অংশে আপনাদের জানাতে চেষ্টা করেছি বিভিন্ন ছোট ছোট বিষয় গুলা যা আমরা অনেকেই জানতাম না এবং কখনো চিন্তাও করিনি যে ব্যপারগুলা ঠিক এরকম হতে পারে। আমরা জেনেছি, ইন্টারনেট কি, কি কি করা যেতে পারে এর সাহায্যে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ওয়েব বা ইন্টারনেটের বিভিন্ন জগতের কথা, আরো জেনেছি হ্যাকিং এর মতো ব্যপারে। যা হোক আজকে আমি আপনাদের জানানোর চেষ্টা করব সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম গুলা ব্যবহারে কুফল নিয়ে। তো চলুন শুরু করা যাক।
প্রযুক্তির ব্যবহার কেড়ে নিচ্ছে শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর। দুরন্তপনার এই বয়সে যখন তাদের দৌড়ঝাঁপ আর মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করার কথা তখন তাদের কাছে খেলাধুলা আর বিনোদন মানেই হচ্ছে সারাক্ষণ বোতামে হাত আর স্ক্রিনে চোখ। এ জন্য ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে দায়ী করেছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ব্যারোনেস গ্রিনফ্লিড। তিনি একে অস্বাস্থ্যকর বলে আখ্যা দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,১৩-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে ভিডিও গেমস, কম্পিউটার, ই-রিডার্স, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্ক্রিনভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পেছনে।
বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যেও প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রতি আসক্তি বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি পরিপূর্ণ মানসিক ও শারীরিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. নাসরীন ওয়াদুদ বলেন, এখনকার শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করে না, গল্পের বই পড়ে না, এমনকি কারো সঙ্গে গল্পও করে না। সারাদিন তারা দরজা বন্ধ করে কম্পিউটার বা মোবাইলফোন নিয়ে পড়ে থাকে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যেই নিজের একটা জগৎ তৈরি করে তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা কার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে সেটাও বাবা-মায়ের জানার কোনো উপায় থাকে না। একদিকে শিশুটির যেমন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের ওপর নির্ভরতা সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবার ও পরিজনের কাছ থেকে তার দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। তখন সে একা থাকতে পছন্দ করছে। দেখা যায়, মানুষজনের মধ্যে থেকেও সে নিজের মতো মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারে ব্যস্ত রয়েছে। সে নিজের সুখ-দুঃখ, কি করছে, কি পড়ছে, কি খাচ্ছে সেটাও ফেসবুকে তুলে দিচ্ছে। নিজেকে প্রদর্শন করা এবং নিজেকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা এটাও একটি মানসিক রোগ। প্রযুক্তির প্রতি আসক্তি যেমন শিশুদের শারীরিক মানসিক বিকাশে ক্ষতি করছে। অন্যদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, মাদক সহ বিভিন্ন
সামাজিক অপরাধে শিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে। আর ব্লু হোয়েল গেইমের নাম তো নিশ্চই শুনেছেন সবাই। কাজেই শিশুদের প্রযুক্তির ব্যবহারের প্রতি আসক্তি দূর করতে জনসচেতনার প্রয়োজন। বাবা-মায়ের যেমন দায়িত্ব তার সন্তানটি কি করছে সেদিকে নজর রাখা। তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুফল এবং কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হবে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকোথেরাপি, এনআইএমএইচ বিভাগীয় প্রধান, অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, শিশু-কিশোরদের মধ্যে অধিক মাত্রায় ভিডিও গেমস বা ফেসবুক ব্যবহারের কারণে তাদের ভেতরের শক্তি আস্তে আস্তে আসক্তিতে পরিণত হয়। তখন সে রাত জেগে খেলে অথবা ফেসবুকিং করে। এতে করে সকালবেলা সে ক্লাসে গিয়ে মনোযোগ দিতে পারে না। তার মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা দেখা দেয়। কারণ ভিডিও গেমস বা ফেসবুক হচ্ছে ভার্চুয়াল লাইফ এটা তো রিয়েল লাইফ নয়। তাই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সে যে সুখ খুঁজে পায় সেটা তো প্রকৃত সুখ নয়। ধীরে ধীরে তার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না। সে নিজের বিষয়ে পরিবারকে কিছু জানাতে চায় না। মানুষের সঙ্গে মিশতে চায় না। তার সমস্যা সে সামাজিক যোগাযোগের
মাধ্যমে সমাধান করতে চায়। ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন তার মানসিক গোলযোগ দেখা দেয়। আবেগ ব্যবস্থাপনায় গোলযোগ দেখা দেয় এবং সামাজিক সম্পর্ক রক্ষায়ও গোলযোগ দেখা দেয়। কারণ সে বড় হচ্ছে প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে। সে যখন নিজের সিদ্ধান্ত
নিজে নিতে পারছে না। তখন সে সমাজের কোনো উপকারে আসতে পারবে না। কারণ সে মনে করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার মত প্রকাশের মধ্য দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ। তাদের মধ্যে প্রকৃত দায়িত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, বিরতিহীনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিশুদের চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে চাপ পড়ে। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করে না। তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কোনো কিছুতে আগ্রহ পায় না। কোনো কায়িক পরিশ্রমের খেলাধুলা তারা করতে চায় না। সারাক্ষণ আঙুল, চোখ ও মস্তিষ্ক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তাদের মনের চাহিদা পূরণ করতে চায়। এক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারই তাদের কাছে সহজ মনে হয়। ফলে নার্ভের সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘ সময় শুয়ে অথবা বসে ভিডিও গেমস বা ফেসবুকিং করার ফলে হাঁটু এবং কোমরে ব্যথ দেখা দেয়। কায়িক পরিশ্রমের খেলাধুলা না করায় অল্প বয়সে তাদের শরীরে চর্বি জমে যায়। এতে করে লিভার, কিডনি সহ হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
তথ্যঃ মানবজমিন।
কম্পিউটার ইন হিউম্যান বিহেভিয়ার সাময়িকীর জুলাই ২০১৪ সংখ্যায় এক গবেষণা-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ‘ফেসবুক, টুইটার বা এ রকম মাধ্যমগুলোতে বেশি সময় দেওয়া মানুষের দাম্পত্যজীবনে অসুখী হতে পারেন, এমনকি বিয়েবিচ্ছেদের কথাও ভাবতে পারেন।' ফেসবুকের ইতিবাচক দিক নিয়ে কথা শুরু করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের
মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুলতানা আলগীন। বললেন, ‘কতগুলো বিষয় ইতিবাচক। ফেসবুকে পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পাচ্ছি, নিজের কথা নিজের কোনো মুহুর্ত ভাগাভাগি করতে পারছি। নেতিবাচক দিক হচ্ছে, সামাজিকতা, সৌজন্যবোধ আমরা হারাচ্ছি। আমরা তো এ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নই।
এখন আমাদেরই কোনো কোনো বন্ধু আছে যাদের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলার আগে বলে নিতে হয় তোমার ওইটা (মোবাইল ফোন) আগে বন্ধ করো, তারপর কথা।’
অতিরিক্ত কাজপাগল যারা (ওয়ার্কোহোলিক), তাদের মধ্যে নানা রকম মানসিক সমস্যা দেখা যায়। জানালেন সুলতানা আলগীন। যোগ করলেন, মাদকাসক্তিসহ নানা রকম আসক্তি এখন দেখা যাচ্ছে।
ফেসবুক আসক্তির নমুনাও চোখে পড়ছে। আর চিকিৎসাবিজ্ঞান তো বলেই দিয়েছে, কোথাও এক নাগাড়ে ৩০ মিনিট বা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার বেশি বসে থাকা স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
বিজয় বাংলা সফটওয়্যার ও লে-আউটের নির্মাতা মোস্তাফা জব্বারের কাজ তথ্যপ্রযুক্তি নিয়েই। ফেসবুকেও তিনি সক্রিয়। তিনি বললেন, ‘সরাসরি, সামনাসামনি সাক্ষাতের কোনো বিকল্প নেই। প্রযুক্তি যে পর্যায়েই যাক না কেন, এর বিকল্প কখনোই তৈরি হবে না। তবে একটা বিষয়, সামাজিক যোগাযোগ বা প্রযুক্তি অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে। যেখানে আমি যেতে পারছি না বা যা পাওয়ার পরিস্থিতি নেই, সেটা পাওয়া
সম্ভব হচ্ছে প্রযুক্তির কল্যাণে। তবে এটা শুধু তেমন জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। বন্ধু, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর না হয়। আবার যখন আমি কারও সঙ্গে কথা বলছি, তখন পূর্ণ মনোযোগ তার প্রতিই থাকা উচিত।’
অনেক বছর আগে বিদ্রূপ ম্যাগাজিন উন্মাদ-এ বিভিন্ন পেশায় থাকা মানুষের আঙুলের ছবি এঁকে ক্যারিকেচার করা হয়েছিল। সেখানে ছিল একজনের হাতের একটা আঙুলের সামনের অংশ ক্ষয়ে গেছে। নিচে লেখা ছিল টেলিফোন অপারেটরের আঙুল। এ যুগে আমরা মোবাইল ফোনের পর্দায় দুই হাতের ১০ আঙুল যেভাবে ব্যস্ত রাখছি, তাতে কোনো কার্টুনে ক্ষয়ে যাওয়া ১০ আঙুল আর হাতের তালুর ছবি দেখা গেলে বিস্ময় জাগবে না।
মোদ্দাকথা, আমরা যেন সমাজের জীব হয়েই থাকি, সামাজিক যোগাযোগ বাণিজ্যের ক্রীড়নকে পরিণত না হই।
তথ্যঃ প্রথম আলো।
এ কথা সত্য যে প্রযুক্তি যেমন আমাদের দিয়েছে বেগ তেমনি কেড়ে নিয়েছে আমাদের আবেগ। অতি মাত্রায় এসব আধুনিক সেবা নিতে আমাদের কার না মন চায় কিন্তু আমাদের শারিরীক ও মানষিক ব্যপারগুলাকে একটু ভেবে দেখা উচিত। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আমাদের নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। আমাদের সবার উচিত সময় থাকতে সচেতন হওয়া। আপনার ছেলেটি বা মেয়েটি ইন্টারনেটে কি করছে, কি দেখছে এসব কিন্তু আপনার জানা দরকার। আপনার নিয়মিত তার ফোন বা কম্পিউটার চেক করা দরকার বলে আমি মনে করি। এছাড়া সে কোন প্রাপ্তবয়স্ক সাইট ভিজিট করছে কি না সেটাও কিন্তু আপনার জানা অত্যন্ত জরুরী।
তবে এখন সবচেয়ে ভয়ের নাম হল ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ। এই গেইমে আসক্ত হয়ে পড়ছে কম বয়সী অনেক ছেলে মেয়ে। এ ব্যপারে এর আগের একটা আলাদা লেখা আছে। আর আমি মনে করছি আমরা যারা সচেতন মানুষ তারা এখন সবাই এ ব্যপারে জানি কম-বেশি। তাই নিজে ভাল থাকুন নিজের পরিবারের খেয়াল রাখুন।
ইন্টারনেটের সাতকাহন ধারাবাহিকে আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।


No comments